বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা টুকরা টুকরা জাতি চাই না। বাংলাদেশকে একটি মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। আমরা আর গডফাদার, গডমাদারদের বাংলাদেশে দেখতে চাই না। মাফিয়াতন্ত্রের বাংলাদেশ দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদের বাংলাদেশ দেখতে চাই না।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পঞ্চগড় জেলা শহরের চিনিকল মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমি যুবকদের বার্তা দিতে চাই, আগামী দিনের বৈষম্যহীন, দুর্নীতি-দুঃশাসনমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য তোমাদেরকে আরেকবার গর্জে উঠতে হবে। জেগে উঠতে হবে। আমিও তোমাদের সাথে থাকবো ইনশা আল্লাহ। আমার আপাদমস্তক সাদা হলেও ‘নো প্রবলেম’। বুকের ভেতরের কালারটা এখনও তরুণ আমার। মানুষের মুক্তির মিছিলে আমি পিছিয়ে থাকব না। তোমাদের সামনে থাকব ইনশা আল্লাহ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই পঞ্চগড়ে আমার আবেগের আসা। ২০২২ সালে নৌকাডুবির সময় এসেছিলাম। তখন নৌকাডুবিতে ৭২ জন মারা গিয়েছিল। আমরা চেষ্টা করেছি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে যাওয়ার। তখন একটাই ছোট শিশুকে কোলে নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেই শিশুটি আজকে এখানে এসেছে। তার নাম দীপু। সে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে। সাধারণত আমরা যেসব শিশুর দায়িত্ব নেই, তার লেখাপড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি দেখলাম আমরা যাওয়ার পরের দিন ওই এলাকার সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং তার স্ত্রী গিয়েছেন। এবং বাচ্চার দায়িত্ব নেন। কিন্তু আজ দীপুর ভাই পরিতোষকে জিজ্ঞেস করলাম- দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিমাসে কি তারা তোমাদের খোঁজ নেয়? বললো জি, না। মাঝে মধ্যে জামা কাপড় দিয়েছে। আমার প্রশ্ন জামা-কাপড় দিলে তারা খাবে কী?
নৌকা ডুবির ঘটনায় পঞ্চগড়ে আসার পর সরকার জেলে নেয় উল্লেখ করে তিনি জানান, ১৫ মাস জেল খাটার পর মুক্ত হয়ে দেড় মাসের মধ্যে সর্বপ্রথম সফর ছিল পঞ্চগড়ে। তিনি নিশ্চয়তা দেন যে আজ থেকে এই শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তার লেখাপড়া চলবে। আমরা প্রতিমাসের এক তারিখে তার বাড়িতে হাজির হবো। আমরা দেখবো না তার মা বাবা কোন ধর্মের মানুষ ছিলেন। আমরা মানুষকে টুকরা টুকরা করতে চাই না। আমরা বাংলাদেশকে একটি মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
আমিরে জামায়াত বলেন, আমাদের কেউ কেউ ভয় দেখায়। তারা বলে যে ‘এই হলে’ ‘ওই হলে’ আবার আপনাদের ফাঁসি হয়ে যাবে। আরে ভাই কাকে ফাঁসির ভয় দেখান। যারা শহীদ হওয়ার জন্য উন্মুখ। এই ভয় করলে আমাদের নেতাদের ফাঁসির পাটাতনে দাঁড়াতে হতো না। সুতরাং আমাদের ফাঁসির ভয় দেখাবেন না।
তিনি বলেন, আমাদের ছোট একটা দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকতে চাই। এর মাঝেই আমাদের গর্ব-সৌন্দর্য। এর মধ্যেই আমাদের শান্তি নিহিত। আমাদের সাফ কথা, আমরা এই দেশে কোন মেজরিটি মাইনরিটি মানি না। আমরা সবাই ইউনিটি। একটাই জাতি আমরা। মেজরিটি মাইনরিটি বলার খাসলত ছিল পতিত স্বৈরাচারের। এরা জাতিকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে মুখোমুখি করে রেখেছিল।
আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা যাদের মাইনরিটি বলতেন, তাদের সম্পদ এবং ইজ্জতসহ তাদের জীবনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধন করেছে তারা। তিনি দাবি জানান, বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে যত ঘটনা ঘটেছে অনুসন্ধান করে তার শ্বেতপত্র বাংলাদেশের জনগণের সামনে প্রকাশ করে দেওয়া হোক।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ একই বিশ্বসভার সদস্য। ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি। আমরা প্রতিবেশি দেশকে অহেতুক কষ্ট দিতে চাইনা। তবে আমাদের প্রতিবেশিও যেন আমাদের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে না দেন, যা বাংলাদেশের মানুষের জন্য সম্মানজনক নয়। যদি এমন হয় তাহলে দেশের স্বার্থে আমরা কারও চোখের দিকে তাকাবো না।
তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, আল্লাহ যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন, তোমাদের এমন শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করবো তখন তোমরা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ভয় করবে। সেই সাথে শ্রেষ্ঠ কারিগরের হাত নিয়ে তোমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হবে। এক দিনের জন্য তোমাদের বেকারত্বের অভিশাপ ভোগ করতে হবে না। এরকম একটা দেশ গড়তে চাই। এজন্য উপস্থিত জনতার কাছে ভালবাসা এবং সহযোগিতা এবং সমর্থন চান ডা. শফিকুর রহমান। আর নারীদের মর্যাদা এবং নিরাপত্তার সাথে দেশের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেও আশ্বস্ত করেন।
তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বৈষম্যহীন দেশে যে এলাকা বঞ্চিত সেই এলাকা সবার আগে তার পাওনা ফেরত পাবে। যে এলাকা পেয়ে গেছে সেই এলাকাও তার ন্যায্য হিস্যা পাবে বলে জানিয়ে দেন। জামায়াতে ইসলামী যতক্ষণ সত্য এবং ন্যায়ের পথে থাকে ততক্ষণ ভালবাসা এবং সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। বলেন, জনগণকে নিয়েই মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবো ইনশা আল্লাহ।